জন্মদিন ও ইসলাম । জন্মদিন ইসলামে হারাম । - গোলাম রাব্বি

জন্মদিন ও ইসলাম । জন্মদিন ইসলামে হারাম । 


জন্মদিন ও ইসলাম

বার্থডে পার্টিটা জমাতে শুরু করেছে অমনি চোরের মত না বলে বেরিয়ে এলাম । বলে কয়ে আসা যেত না । যাওয়ার একদম ইচ্ছে ছিল না । নিতান্ত নিরুপায় হয়ে যাওয়া ।
বৃহস্পতিবারের রাত এগারোটায় মানুষগুলো যেন আগে ভাগেই আজ ঘরে ঢুকেছে । নীরব রাতে মেঘে ঢাকা আকাশের নীচে রিক্সায় বাসায় ছুটছি ।

গ্রিকদের চাঁদের দেবী আর্টেমিস দেখছে আমি ছুটে পালাচ্ছি । সেটা ভেবে হঠাৎ যখন হেসে উঠলাম তখন রিক্সাচালক ভাই ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক চোখে আমায় দেখে নিল ।

গোলাকৃতির বিশাল ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেকের উপর হ্যাপি বার্থডে লিখা । আর তার উপর পাঁচটা মোমবাতি জ্বলছিল ।যার বার্থডে তারবয়স ৫০ বছর হতে চলেছে, তার জন্য পাঁচটা মোমবাতি। যার জন্মদিন সে মনে মনে একটা উইশ করে মোমবাতি নেভাবে। বলা হয়ে থাকে যে এক ফুঁতে সমস্ত মোমবাতি নেভাতে পারলে তোমার চাওয়া পূর্ণ হবে। তবে তুমি কী চাইছ, সেটা কাউকে বলা যাবে না, তাহলে কিন্তু সেটা পূরণ হবে না।

প্রাচীনকালে গ্রিকরা প্রায় চাঁদের মতো গোল আকৃতি দিয়ে কেক বানাত। সেই কেকটা বানানো হতো চাঁদের দেবী আর্টেমিসের জন্য। কেকটা যেন চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করে, সে জন্য কেকের গায়ে অনেকগুলো জ্বলন্ত মোমবাতি বসিয়ে দেওয়া হতো। গ্রিকরা মনে করত, আর্টেমিসের উপর থেকে তাদের কেকটাকে দেখতে পাচ্ছেন। এরপর সবাই মিলে প্রার্থনা করে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিত। আর ভাবত যে সেই মোমবাতির ধোঁয়া তাদের প্রার্থনা নিয়ে দেবতার কাছে চলে যাচ্ছে।

জার্মানরাও মোমবাতি ব্যবহার করত কেকের ওপর। ছোট ছোট মোমবাতি দিয়ে কেকের চারপাশটা সাজিয়ে দিত আর মাঝখানে থাকত একটা বড় মোমবাতি। এই বড় মোমবাতিতে ১২টা দাগ টানা ছিল। এ দিয়ে বছরের ১২ মাস বোঝানো হতো। এটাকে তারা বলত লাইট অব লাইফ।

মধ্যযুগে জার্মানরা যিশুর জন্মদিন উদ্যাপনের জন্য ময়দা দিয়ে এমনভাবে কেক তৈরি করত যে দেখে মনে হতো শিশু যিশুকে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছে। ধীরে ধীরে একসময় ছোট শিশুদের জন্মদিন পালন করা শুরু হয়। এটাকে বলা হতো কিন্ডারফেস্ট। কিন্ডার মানে শিশু আর ফেস্ট মানে উৎসব। তারা মনে করত, এর মাধ্যমে তাদের সন্তানদের পবিত্র আত্মাকে দুষ্ট আত্মা থেকে রক্ষা করা যাবে।

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ আসলে মূল গানটা ছিল গুড মর্নিং টু ইউ। গানটা তৈরি করেছিল দুই আমেরিকান বোন প্যাটি হিল ও মিলড্রেড হিল।

পরবর্তী সময়ে সুর করে আর হইহুল্লোড়ে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গেয়ে কেক কাটা শুরু হয় ।কারণ মনে করা হতো, জন্মদিনের দিন দুষ্ট আত্মা যার জন্মদিন, তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তাই যত হইচই করা যাবে দুষ্ট আত্মা ভয় পেয়ে তত দূরে ভেগে যাবে।

বহু আগে থেকেই কিন্তু জন্মদিন পালন হতো। রাজা-বাদশাহদের যুগে তাদের জন্মদিন খুব জাঁকজমক করে পালন করা হতো। কারণ, তখন এমনটা ভাবা হতো যে বড় বড় মানুষদের পিছে সব সময় দুষ্ট আত্মা বা অশুভ শক্তি ঘুরঘুর করে। নতুন বছরে রাজা-মহারাজার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, তাই শয়তান তাড়াতেই জন্মদিন করা হতো।

লিখিতভাবে জন্মদিনের কথা প্রথম জানা যায় বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায় থেকে। মিশরের ফারাওদের জন্মদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন ছিল মিশরে। বাইবেলে জন্মদিনের কথা বলা থাকলেও সেটি জন্মের দিন নাকি সিংহাসনে বসার দিন সেটি নিয়ে ইজিপ্টোলজিস্টদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। প্রাচীন মিশরে ফারাওদেরকে ঈশ্বর মনে করা হতো আর সিংহাসনে বসার দিনটিকে মনে করা হতো তাদের মানুষ থেকে ঈশ্বরে রূপান্তরের দিন। তাই ঠিক ‘ঈশ্বরে রূপান্তরের দিনটিকে’ বেশ ধুমধামের সাথেই পালন করা হতো।
“তৃতীয় দিনটি ছিল ফারাউনের জন্মদিন। ফেরাউন তার সব কর্মকর্তাদের জন্য ভোজের আয়োজন করেন। ফেরাউন তার মদ-পরিবেশক ও রুটি প্রস্তুতকারককে ক্ষমা করে দিলেন”। [ওল্ড টেস্টামেন্ট, জেনেসিসঃ ৪০-২০]

ভূমধ্যসাগরের বাইরে পারস্যে সাধারণ জনগনের জন্মদিনের কথা হেরোডোটাসের লেখা থেকে জানা যায়। ধনীরা তাদের জন্মদিনে বেশ বড়সড় ভুড়িভোজের আয়োজন করতো পারস্যে। প্রাচীন ভারত কিংবা চীনে সাধারণ জনগনের জন্মদিনে পালনের তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের জন্মদিন উপলক্ষ্যে জন্মাষ্টমী বেশ অনেক বছর ধরেই ভারতবর্ষে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ঘুরে ফিরে জন্মদিন সেসময় দেব-দেবী কিংবা রাজা-বাদশাহদের জন্মদিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল মূলত।

প্যাগান সমাজে জন্মদিন পালনের রীতি থাকলেও সেমেটিক সমাজে জন্মদিন মোটেও স্বাভাবিক নিয়ম ছিল না। বরং প্যাগানদের থেকে উৎপত্তি হবার কারণে ইহুদী ও খ্রিস্টানরা প্রথমদিকে জন্মদিন পালনকে শয়তানের রীতি হিসেবে মনে করতো। তবে খ্রিস্টানদের ধ্যানধারণা পাল্টাতে থাকে চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে। প্রথমদিকে কোনো নিয়ম না থাকলেও চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে ঈসা (আ) এর জন্মদিন পালন শুরু করে খ্রিস্টানরা। এর ফলে খ্রিস্টান চার্চগুলো জন্মদিন পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকে।

মাথায় এসব ঘুরপাক খেতে খেতে কখন বাসার সামনে এসে পড়লাম হুঁশ নাই ।
তবে এটা ঠিক গ্রিক দেবী আর্টেমিসকে খুশী করার জন্য আমরা জন্মদিনে মোমবাতি জ্বালাই না । এবার এটাও ঠিক আমরা বেশীর ভাগই জন্মদিনের এই ইতিহাসগুলো জানি না । আবার কেউ কেউ বলবে ‘তাতে হইছে কি’ ?

অথচ এই আমরাই মরে গেলে হুজুর ডেকে জানাজা পড়াই, খুব সুন্দর করে সাদা কাপড়ে মুড়াই, খুব যত্ন করে শুইয়ে কবরে শুইয়ে দিয়ে আকাশের দিকে এক আল্লাহকেই ডাকি ।

গ্রীক দেবী আর্টেমিস, বাইবেলের যীশু, শ্রী কৃষ্ণ, ফেরাউনরা আর প্যাগানদের রীতি মানবেন আর দাফন দিয়ে আল্লাহকে ডাকবেন ব্যাপারটা কি অত সোজা !
Next Post Previous Post